Header Ads Widget

চুনিয়ার সাংসারেক ওয়ান্না পাঠ ঃ প্রাণবৈচিত্র্য ও সংরক্ষণ কেন্দ্রিক মান্দিদের আপন বিশ্বাস ও আপন জ্ঞান কাঠামোর কিছু বিক্ষিপ্ত আলাপ




১. 

পৃথিবীর প্রায় সকল জাতিগোষ্ঠীই  প্রকৃতির সাথে নিবিড় সর্ম্পক জিইয়ে রেখে নিজেদের সকল ধরণের চাহিদার যোগানের মাধ্যমে টিকে থাকার লড়াই জারি রাখেন। আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী সমূহের মধ্যে প্রকৃতির সাথে সর্ম্পকের বিষয়টি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের আপন আপন বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত হয়, নিয়ন্ত্রিত হয় তাদের দীর্ঘদিনের অর্জিত সামস্টিক জ্ঞানের দ্বারা- যে জ্ঞানের ভিত্তি গড়ে উঠে পুস্তকি জ্ঞান কাঠমোকে অনুসরণ করে নয়, গড়ে উঠে তাদের দৈনন্দিন জীবনাচারের নানানমুখী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভেতর দিয়ে এবং তা চর্চিত হয় জাতিগত পরম্পরায়। এই নিজস্ব জ্ঞান আর তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মিলেমিশে থাকে, একে অন্যের অপরিহার্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এই নিজস্ব জ্ঞান আর নিজস্ব বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে জাতিগোষ্ঠীসমূহ তাদের স্বাতন্ত্র্য সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল গড়ে তোলেন, অর্থ্যাৎ নিজেদের স্বাতন্ত্র্য পরিচিতি তৈরিতে সমর্থ্য হন। এই সকল জাতিগোষ্ঠীসমূহ আশপাশের বাস্তসংস্থান (Ecosystem) থেকেই তাদের জীবনধারণের প্রয়োজন মেটায়। জীবন ধারণের প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে বাস্তুতান্ত্রিক (Ecological) নানান উপাদানের সাথে এদের দীর্ঘকালীন মিথস্ক্রিয়ায় ফলে এমন একটা অবিচ্ছেদ্য অবস্থান বা সর্ম্পক গড়ে উঠে, যা দিয়ে ঐ নির্দিষ্ট এলাকার বাস্তুতন্ত্রকে, বাস্তুতন্ত্রের জীবিয় উপাদান তথা প্রাণবৈচিত্র্যকে এবং এদের মধ্যকার আন্তসর্ম্পককে নতুন ভাবে পাঠ করা সুযোগ করে দেয়। এই আন্তসম্পর্কীয় পাঠ এই জন্যই গুরুত্বপূর্ণ যে, এর মাধ্যমে আমরা একই সাথে বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার পাঠ পর্যালোচনার সুযোগ পাই। মান্দিদের ওয়ান্না পাঠ নিছকই ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পাঠ নয়, ওয়ান্নার বিভিন্ন আচার-বিশ্বাস,প্রথা আমাদেরকে মান্দিদের মধ্যে বাস্তুতন্ত্র, প্রাণবৈচিত্র্য ও প্রাণবৈচিত্র্যের সংরক্ষণের আপন জ্ঞান কাঠামোকে কিছুটা হলেও সামনে নিয়ে আসে বা অন্যভাবে বলা যায় সাংসারেক ওয়ান্না পাঠের মাধ্যমে মান্দিরা যেসকল ভৌগলিক অবস্থানে বাস করেন সেখানকার বাস্তুতন্ত্র বা প্রাণবৈচিত্র্যর একটা প্রতিচিত্র আমাদের সামনে হাজির হয়। 


২.

স্পর্শকাতরতাময় এই নাম

উচ্চারণমাত্র যেন ভেঙে যাবে,

অন্তর্হিত হবে তার প্রকৃত মহিমা-

চুনিয়া একটি গ্রাম, ছোট্ট কিন্তু ভেতরে ভেতরে খুব শক্তিশালী

মারণাস্ত্রময় সভ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।


[ কবি রফিক আজাদের চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া কবিতার অংশবিশেষ]



প্রথাগত বাস্তুতান্ত্রিক জ্ঞান (Traditional Ecological Knowledge) আসলে জাতিগোষ্ঠীসমূহের যাপিত জীবনে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের যে নানানমূখী মিথস্ত্রিয়া, সেই মিথস্ক্রিয়ার ফলে একটা দীর্ঘ অজ্ঞিতালব্ধ জ্ঞান, যা পরম্পরাগতভাইে জাতিগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে চর্চিত হয়। মধুপুর শালবনের চুনিয়া গ্রাম। শালবন ঘেরা এই গ্রামের সকল বাসিন্দাই এখনো পর্যন্ত মান্দি জাতিগোষ্ঠীর। একসময় এই গ্রামের মান্দিদের সকলেই নিজস্ব সাংসারেক ধর্মের অনুসারী হলেও বর্তমানে সাংসারেক হাতেগোনা দুয়েকজন। ১৯৪০ সালে মধুপুর শালবনে আইন করে মান্দিদের পুরনো চাষাবাদ পদ্ধতি জুম বা হাবাহুয়াকে নিষিদ্ধ করা হয়। উৎপাদন পদ্ধতি আর ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিবর্তন হেতু স্বভাবতই সাংসারেক ধর্মের আচারাদি নিঃশেষ হওয়ার পথে। দীর্ঘ প্রায় ৪০/৫০ বছর পরে চুনিয়া গ্রামেরই সাংসারেক জনিক নকরেক এর নিজস্ব উদ্যোগে ২০০৩ সালে আবারো আদি সাংসারেক নিয়মাচার পরিপালন করে তিনদিন ধরে উদযাপিত হয় সাংসারেক ওয়ান্না। উদ্দেশ্য ছিল দুনিয়া থেকে সাংসারেক ধর্ম ও ধর্ম বিশ্বাসীরা হারিয়ে যাওয়ার আগে কিছুটা হলেও নতুন প্রজন্মের সামনে নিজেদের সাংসারেক ধর্ম আর সংস্কৃতির কিছু বিষয় তুলে ধরা। সেই থেকে শুরু হয়ে প্রতিবছরই জনিক নকরেক এর বাড়িতে সাংসারেক নিয়মে ওয়ান্না পালিত হয়ে আসছে। সাংসারেক ওয়ান্না মূলত মান্দিদের ধর্মীয়-সামাজিক কৃত্য হলেও স্থানিক বাস্তুতন্ত্র ও প্রাণবৈচিত্র্য পাঠের ক্ষেত্রে তার গুরুত্ব অপরিসীম। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ন্যায় মান্দি জাতির জীবনাচারের পরতে পরতে স্থানিক বাস্তুতন্ত্রের প্রাণবৈচিত্র্যের সাথে অত্যন্ত নিবিড় ও ঘনিষ্ট সর্ম্পক রয়েছে। এই সম্পর্কের ধরণ স্বভাবতই তাদের প্রাত্যহিক জীবন বা সংস্কৃতিতে নানান ভাবে প্রস্ফ’টিত হয়ে থাকে। 


৩.   

মান্দিদের ওয়ান্না পাঠ বেশ বড় একটা পরিসর। এখানে দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞানসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের আরো বিভিন্ন ধারার আঙ্গিকে পাঠের সুযোগ রয়েছে। এখানে মূলত ওয়ান্নার সাথে সম্পর্কিত প্রাণবৈচিত্র্য পাঠের দিকে মনোনিবেশ করতে চাই। কেননা প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণ প্রকৃতি নির্ভর যে কোন জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক নৈতিকতার একটি গুরুত্বর্পূণ জায়গা । আগেই বলা হয়েছে মান্দিদের ওয়ান্না জুম চাষ বা হাবাহুয়ার সাথে সম্পৃক্ত। জুম চাষের বিভিন্ন ধাপে পেরিয়ে নতুন শস্য-ফসলাদি ঘরে উঠার পর পালন করা হয় ওয়ান্না। 


মান্দিদের আদি ধর্মের নাম সাংসারেক। সাংসারেক ধর্মীয় বিশ্বাসে ওয়ান্না হলো দেবতা মিসি -সালজংকে নতুন ফসলাদি উৎসর্গ করা ও দেবতাদের সন্তুষ্টি কামনা। উৎপাদিত নতুন ধান কাটার পর দেবতাদের উৎসর্গ না করে খাওয়ার রীতি নেই মান্দি সমাজে। সেজন্য ওয়ান্নার আগে রংচুগালার আয়োজন করার রীতি প্রচলিত রয়েছে। রংচুগালাতে নতুন ধানের চিড়া দেবতাদের উৎসর্গ করার পর তা সিদ্ধ করে খাওয়ার অনুমতি মেলে সাংসারেক নিয়মে। নতুন ধান তোলা থেকে রচুগালা পর্যন্ত এই সময়টা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই সময়েই ধানের ভাল বীজগুলো সংরক্ষণের উপযুক্ত সময়। অন্যভাবে বললে, জুমে উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের ধানের বীজ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা থেকেই হয়তো মান্দি সমাজে এই ট্যাবু প্রচলিত হয়েছিল যে, রংচুগালা না করলে ধান থেকে পাওয়া চাল সিদ্ধ করে খাওয়া যাবে না। এর মধ্য দিয়ে মান্দিদের বীজ সংরক্ষণের নিজস্ব জ্ঞানের পরিচয় ঘটে আমাদের। একসময় মান্দিদের বেশ সমৃদ্ধ বীজ ভান্ডার থাকলেও বর্তমানে তা শুণ্যের কোঠায়। সাংরেমা রংথাম্ব্রেং, দেমব্রজাগেদেং, মি.মা সারাং, মি.নেঙ্গেল, মি.মা, মি.খচ্চু প্রভৃতি জুম ধানের জাত আজ আর নেই। মান্দি জীবনাচারে প্রকৃতির জীবিয় বা অজীবিয়  কোন উপাদানেরই যথেচ্ছ ব্যবহার নেই, পরিমিত ব্যবহার আর প্রথাগত সংরক্ষণ কৌশলের প্রয়োগের মধ্য দিয়েই স্থানিক বাস্তুতন্ত্রের সাথে তাদের ঘনিষ্ট সংযোগকে অবিচ্ছিন্ন রেখে চলে।


ওয়ান্না গ্রামের মানুষজনের সামর্থ্য বিবেচনায় ১/৩/৫/৭ দিন ব্যাপীও হতে পারে। ওয়ান্নার প্রথম দিনে মিদ্দি রাক্কাশির আমুয়ার মাধ্যমে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। রাক্কাশি আমুয়াতে তল্লা বাঁশ (Bambusa longispiculata) দিয়ে দেবতার কাঠামো বানিয়ে পূজা করা হয়। রাক্কাশি আমুয়াতে খামালের ব্যবহার্য উপকরণ হচ্ছে- গামিদ্দি [মাহাঞ্চি গাছের পাতা (Callicarpa arborea), খিল (তুলা)সূতা দিয়ে বেঁধে এটি তৈরি করা হয়], চিওয়াসিং [তল্লা বাঁশ দিয়ে তৈরি পানির পাত্র বিশেষ], ফং [চু এর পানপাত্র-লাউজাতীয় গাছের (Lagenaria  siceria) খোল দিয়ে তৈরি], ধূপ। রাক্কাশির কাঠামো বানাতে আরো যেসকল উপদান ব্যবহার করা হয় সেগুলো হলো-খিল(Bombax ceiba), মাহাঞ্চি(Callicarpa arborea) ইত্যাদি। রাক্কাশির আমুয়াতে দো(Gallus gallus domesticus) উৎসর্গ  করা হয়ে থাকে। বাঁশ দিয়ে দেবতাদের কাঠামো বানানোর প্রক্রিয়াকে বলা হয় সামবাসিয়া। সামবাসিয়ার জন্য যেসকল উদ্ভিদরাজি সংগ্রহ করা হয় সেগুলো কাটার পূর্বে বিশেষ প্রার্থণা করা হয় মনে মনে। প্রার্থণায় ঐ সকল উদ্ভিদ রাজি ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হয়, কোনভাবেই কোন আমুয়াতে ব্যবহৃত উদ্ভিদরাজি সমূলে উৎপাটন করা হয় না। মান্দি সাংসারেক মতে প্রকৃতির কোন কিছুর সম্পূর্ণ বিনাশ মারাং বা দূষণীয় জ্ঞান করা হয়। 


রাক্কাশির আমুয়ার পর ওয়ান্নার মূল পর্ব শুরু হয়ে যায়। নকমান্দির প্রবেশ পথের ডান পাশের প্রথম খুটিটিকে বলা হয় মিনজিরি। মিনিজিরির পাশে একটা বাঁশের তৈরি মাচাং এর কাঠামো বানানো থাকে। এটাকে মিনজিরিনি অঙ্গারি বলে। সাংসারেক বিশ্বাস মতে, মিনজিরিতে দেবতারা অবস্থান নেন। ওয়ান্নার মূল কাজ শুরু হয় এই মিনজিরির সামনে নতুন ফসলাদি দেবতাদের উদ্দেশ্যে রুগালার মাধ্যমে উৎসর্গ করার মাধ্যমে। এজন্য একটা হিচু বিজাকে বা কলাপাতয় (Musa spp.) জুমে উৎপাদিত ফসলাদি-আখারু(Benincasa Hispida), মিগারু(Setaria italica), হিচিং(Zingiber officinale) সহ অপরাপর শস্য-ফসলাদি এবং বন থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন ধরণের বনআলু যেমন- থা.থুরাক, থা.মান্দি, গোমেন্দা, স্থেং ইত্যাদি রেখে খামাল বা পুরোহিত লাউজাতীয় ফলের খোল দিয়ে তৈরি ফং (Lagenaria  siceria standl.) ভর্তি চু (মান্দিদের ঐতিহ্যবাহী নিজস্ব পানীয়) নিয়ে মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে দেবতাদের উৎসর্গ করেন। এখানে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, ওয়ান্নার পরপরই যেহেতু মান্দিরা নতুন শস্য-ফসলাদি খাওয়ার সুযোগ পান সেহেতু ফসল তোলার পর প্রথমেই সকল ফসলের বীজ সংরক্ষণ করা হয় বেশ যত্ন সহকারে। বীজ সংরক্ষণের এই রীতি চর্চিত হয়ে থাকে বংশ পরম্পরায়। তাছাড়া বন থেকে মাটি খুঁড়ে যে সকল বনআলু সংগ্রহ করা হয় সেগুলো সম্পূর্ণ উৎপাটন করা হয় না কখনো। রিজেনারেশনের জন্য বন আলুর কিছু অংশ মাটির নিচে রেখে দেওয়া হয়। এই সংরক্ষণ ধারণা ও এর চর্চা বেশ শক্তিশালী মান্দি সমাজে, যা এখনো প্রচলিত। 


ওয়ান্নাতে প্রচলিত খাদ্যাভ্যাস রীতিতে রয়েছে পূর্ণ প্রকৃতি নির্ভরতা। প্রাকৃতিক সব উপাদানকে ঘিরেই মান্দিদের প্রচলিত খাদ্য সংস্কৃতি। ওয়ান্নাতে ভাতের সাথে বিখাজাবা/বিখাসাম বেশ প্রচলিত। শুধু ওয়ান্নাতেই নয়, মান্দিদের যে কোন সামাজিক অনুষ্ঠানের ভোজেও বিখাজাবা/বিখাসামের প্রচলন রয়েছে। ওয়াকের চর্বি বিহীন মাংস, কলিজা ওয়াকের রক্ত, বলব্রেত বিজাক (Lagenaria  siceria standl.), কাক্কু বিজাক(Melastoma malabathrica), ফাসিম বিজাক(Paederia foetida),শুকনা মরিচ বা কাঁচা মরিচ(Capsicum frutescens), খাবার সোডা, সামান্য আওলা চাউল আর লবন পরিমাণ মতন মিশিয়ে রান্না করা হয় বিখাজাবা/বিখাসাম। ওয়ান্না বা যেকোন সামাজিক-ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এখনো আগত অতিথিদেরকে আগাছি বা হিচু পাতায় খাবার পরিবেশন করতে দেখা যায়। বিখাজাবা/বিখাসামে কোন প্রকার ভোজ্যতেল ব্যবহার করা হয় না। নিকট অতীত কালেও মান্দিরা রান্নায় নিজেদের প্রস্তুত করা ক্ষার বা এলকালি ব্যবহার করতেন। এই ক্ষারকে বলা হতো হা.দিবু।  হা’দিবু বা ক্ষার তৈরিতে বিভিন্ন গাছগাছালির অংশ বিশেষ পুড়ানো হয়। প্রাপ ফাং (Ficas benghalensis)  এর ঝুরি বা শেকড়, খিল বিফাং (Bombax ceiba) এর শেকড় ও ডাল, এছাড়া সিলসু (Brassica campestris),কালাই বিফাং (Sesamum indicum), তিল বিফাং এর পুরো গাছ পুড়ে ছাই  গ্রেংরেং (বাঁশের তৈরি ফানেল আকৃতির ছাকনি বিশেষ) এর মধ্যে রেখে সেখানে ধীরে ধীরে পানি ঢেলে দেওয়া হয়। গ্রেংরেং দ্বারা ছাঁকা এই পানিই হা.দিবু বা ক্ষার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই ক্ষার আসামের আরো বোডো,রাভা প্রভৃতি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যেও প্রচলিত রয়েছে। ওয়ান্না বা যেকোন সামাজিক-ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এখনো আগাছি (Dillenia pentagyna) বা হিচ ু(Musa sepientum) পাতা খাবারের প্লেট হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।


ও...ও...ও...

মেন্দা চানা ইন্নোদে

দেন্নি রাঙবো খাম্বিসা।।

চিংখো দংনা ইন্নোদে

সেঙি দংবো বিলসিসা

হারেরে...হারেরে...


ভাবানুবাদ ঃ

টক পাতা খেতে চাইলে

ভেঙ্গে নাও ডাল আগার

আমাদের বিয়ে করতে চাইলে

অপেক্ষায় হবে বছর পার

হারেরে...হারেরে... 


ওয়ান্নাসহ যেকোন সামাজিক অনুষ্ঠানেও মান্দিদের মধ্যে ঐতিহ্যবাহী পানীয় চু এর প্রচলন রয়েছে। বলা হয়, মান্দি সমাজে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত চু এর ব্যবহার রয়েছে। চু মূলত রাইস বিয়ার। বর্তমান বিশ্বে রাইস বিয়ারের বেশ কদর তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্য সচেতনদের মধ্যে। বিভিন্ন গবেষণায় রাইস বিয়ারের খাদ্যমান তথা পুিষ্ট মান এখন বিশ্বব্যাপী আলোচিত । মান্দিদের চু সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি করা পানীয়। এই চু তৈরিতে যে ফার্মেন্টার ব্যবহৃত হয়, মান্দি ভাষায় যাকে চুমান্থি/সুমাঞ্চি বলা হয় সেটাও মান্দিরা নিজেরাই তৈরি করে থাকেন বিভিন্ন গাছের লতা-পাতা-বাকল-ফল দিয়ে। চুমান্থি তৈরীতে সাধারণত নাকদানা গাছের (Artemisia dubia) পাতা, থিব্রং (Artocarpus heterophyllus) এর পাতা, শুকনা জালিক (Capsicum frutescens), থাবলচু (Capsicum frutescens) গুঁড়া,  আচেত্রা পাতা (Plumbago zeylantical), আখের (Saccharum officinarum) কচি পাতা, সামাখ্যি (Clerodendrum viscosum Vent.) গাছের কচি পাতা, লাউয়ের পাতা (Lagenaria  siceria) ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।  মান্দিরা একটানা চু পান করে না। চু পানের সময়টা মান্দি সমাজে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। চু পানের স্থানে উপস্থিত সকলে বিভিন্ন সামাজিক বা পারিবারিক বা জাতিগত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করেন। চু পানের ফাঁকে ফাঁকে আরো কিছু খাবারের প্রচলন রয়েছে, যেগুলো মুখে স্বাদের ভিন্নতা এনে দেয়। সামষ্টিকভাবে এগুলোকে খাজি নামে অভিহিত করা হয়। খাজি বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। থানিং ভর্তা (শুকরের মগজ পুড়ে তৈরি ভর্তা), খিওয়েক (ছাগলের ভ‚ড়ি দিয়ে তৈরি ভর্তা বিশেষ), আফলকা (Momordica subangulata sub spp. renigera),মধু বিবাল,গপ্পা, নাখাম ভর্তা, খিমখা (Solanum kurzii L), আদুরাক, সেরেংখি, আলৎ বিবাল (Phlogacanthus thysiformis Nees.), মেন্দা ভর্তার (Hibiscus sabdariffa L.) প্রচলন রয়েছে। 


ওয়ান্নার সময় প্রধান ভোজের জন্য জ¦ালানী কাঠের সরবরাহ মূলক আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকেই হয়ে থাকে। এই জ¦ালানী কাঠকে মান্দি ভাষায় বলা হয় হাবল। হাবল সাধারণত নারীরাই সংগ্রহ করে থাকেন বন থেকে। বনের যে কোন জীবিত গাছের চেয়ে মরা শুকনো গাছের ডালই হাবল হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন। গাছের মরা ডাল কাটতে সহজ, শুকনো হওয়ায় সহজে বহণযোগ্য। সাধারণত বলমাত্রা,গাকড়ি,বলদুবাক,কাকক্কেল দুধকুরুষ,মাক্কাগেল,গা¹ল ফাং এর ডালই হাবল হিসেবে অধিক সংগ্রহ করে থাকেন।  


সকবা রিমজক সংগুমিকনী

চন্না দাল্লা ওয়ানগাল্লাআও

নকগা নকটিপ সিননিও গাটরিমজকমা মিগিদালমু

দাসি মিজাও মেথ্রা পান্থি আজি রোয়ানা।।

দামা বাংশি রাং ক্রাম আচিকটাংনী মিকখাংও

নাসং আচিক জাতরাং মিননা রিমব নাছিলটাং

 রুগাল্লাখু নিয়াং রিমব মিকগ্রæন্টাংচা ওয়ানগাল্লাখু


মিসি সালজং গুয়েরা পান্থি সকজক দাআলখো

দরু আজি সেরেজিং রেরে গুরিরোনা দাআলখো

দকগেৎ রিমব দামা বাংশি রাং ক্রাম আদুরিখো

দাসি মিজাও মেথ্রা পান্থি আজি রোয়ানা। 


(ওয়ান্না বা ওয়ানগালার গান, কথা ও সুর ঃ তিরেশ নকরেক, পীরগাছা, মধুপুর, টাঙ্গাইল)


ওয়ান্নাতে ব্যবহৃত মান্দিদের বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ ও প্রাণীজ উপকরণের ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। দামা, খ্রাম, নাথোক (ঢোলক জাতীয় বাদ্যযন্ত্র) তৈরিতে গামারী গাছের (Gmelina arborea) ব্যবহার করা হয়। আবার লম্বা তল্লা বাঁশের(Bambusa longispiculata) এক মাথায় মহিষের শিং(Bubalus bubalis) বেঁধে বানানো হয় আদুরি নামের বাদ্যযন্ত্র। সুমু-চেঙ গাছের (Zanthoxylu rhesta  Fam. Rutaceae) কাঠ ও পিতল দিয়ে তৈরী করা হয় সানাই জাতীয় বাদ্যযন্ত্র। এছাড়া বাঁশি জাতীয় অলংমা, উথাখারু, গংগেন্দা তৈরিতে ব্যবহার করা হয় বাঁশ। মাটির তৈরি অর্ধবৃত্তকার পাত্রের  খোলা মাথায় গরুর (Bos indica) মাথার চামড়া বেঁধে বানানো হয় নাগাড়া নামের বাদ্যযন্ত্র।


মান্দি মিথলজিতে মিদ্দি বাগবা সকল প্রাণের জন্মদাত্রী বলে বিবেচিত। বিভিন্ন আমুয়াতে মাটি দিয়ে মিদ্দি বাগবার যে প্রতিকৃতি বানানো হয় সেখানে মিদ্দি বাগবার মাতৃরূপটাকেই ফুটিয়ে তোলা হয়। সাংসারেক বিশ্বাস মতে, প্রকৃতির সকল জীবিয় উপাদানই তাঁর গর্ভজাত সন্তান। সেই হিসেবে প্রকৃতির যত উদ্ভিদ-প্রাণী, পোকা-মাকড়সহ যত জীব রয়েছে প্রত্যেকেই রক্তের সম্পর্কে সর্ম্পকিত বলে বিশ্বাস করেন সাংসারেক মান্দিরা। তাই একই মায়ের অপরাপর সন্তানদের বিনা প্রয়োজনে কোনরূপ ক্ষতি সাধন করা মারাং। দেবতা মিসি আর সালজং রাংদি বিমা রাই মিচ্চিক এর ঘরে প্রথম মি.নিমা,(ধানের মা), নি.নিমা (আনাজের মা)র জন্ম দিয়েছিলেন। বাতলে দিয়েছিলেন ধান থেকে কিভাবে ভাত রান্না করতে হয় তাও। এছাড়া মি.নিমা দেবতা মিসি আর সালজং এর কাছে এই বর চেয়ে রাখলেন তাদের যেন সারাবছরই গোলাঘওে আবদ্ধ অবস্থায় থাকতে না হয়। বছরে অন্তত একবার হলেও তারা যেন মান্দিদের সাথে নাচ-গানে অংশ নিতে পারে। মিসি-সালজং বলে গেলেন প্রতিবছর ওয়ান্নাতে যাতে বীজ ধানের আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা করেন মান্দিরা। সেই থেকে সাংসারেক মান্দিরা ওয়ান্নার সময় জলআন্নার দিনে গুরিরুয়াতে বীজ ধানের হিজা (ধানের শীষ) খোঁপায় গুঁজে নিতেন। উল্লেখ্য, আগের দিনে জুমিয়া মান্দিরা বীজ ধান সংরক্ষণ করতেন পুরো শীষসহ। এখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা বাদেও আরেকটা বিষয় আমাদের সামনে হাজির হয়। সেটা হচ্ছে, মান্দিদের নিজস্ব বীজ সংরক্ষণ রীতি। এই যে, প্রতিবছর ওয়ান্নাতে গুরিরুয়াতে বীজ ধানের হিজা চুলের খোপায় গোজা হয়, এর মাধ্যমে সংরক্ষিত বীজ ধানের বর্তমান অবস্থাও পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়। গুরিরুয়ার জন্য ব্যবহৃত ধানের হিজা পরীক্ষা করে যদি সংরক্ষণ প্রক্রিয়ায় কোন ত্রæটি-বিচ্যুতি ধরা পরে তাহলে সেগুলো শুধরে নেওয়া হয়। অর্থ্যাৎ সংরক্ষণ প্রক্রিয়া যথাযথ হচ্ছে কিনা সেটা পরখ করে নেওয়ারও একটা তরিকা এটা। 


আগেই বলা হয়েছে রুগালার আগে মান্দিরা নতুন ধানের ভাত রান্না করে খেতে পারেন না ধর্মীর ট্যাবুর কারণে। আবার ওয়ান্নার আগে আ.খারু, মিগারু, থারেং, থা.থুরাক খেতে পারেন না। উৎপাদিত শস্য-ফসলাদির বীজ সংরক্ষণের জন্য ফসল তোলার পর থেকে ওয়ান্নার মধ্যবর্তী সময়কে বেছে নেওয়া হয়। এই সময়টাতে  বিভিন্ন ফসলের উৎকৃষ্ট বীজ বাছাই করে সেগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার পর গ্রামের নকমা কর্তৃক ঘোষিত দিনে মিসি-সালজংকে উৎর্সগ করার পর নতুন শস্য-ফসলাদি খাওয়া শুরু করেন। এখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে লোকায়ত জ্ঞানের একযুথবদ্ধ প্রয়োগ দেখা যায় স্থানিক বাস্তুতন্ত্রের প্রাণবৈচিত্র্যের প্রবাহমান ধারাকে সজীব ও অটুট রাখার জন্য।


জাতিগোষ্ঠীসমূহ আপন সংস্কৃতি চর্চার মধ্যদিয়ে তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের মধ্যকার প্রাণবৈচিত্র্যের স্বরূপ ফুটে ওঠে। কালের বিবর্তনে নানান কারণে এসকল প্রাণবৈচিত্র্যের অনেক কিছুই সেই ভৌগলিক অবস্থান থেকে হারিয়ে যায়, কিছু বর্তমান থেকে যায়। জাতিগোষ্ঠী সমূহের নাচের মুদ্রা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে হলেও ঐ স্থানিক প্রতিবেশের অতীত ও বর্তমান প্রাণবৈচিত্র্যের মধ্যকার পাঠপর্যালোচনার সুযোগ মেলে। সাংসারেক মান্দিদের ওয়ান্নাতে অধিকাংশ নাচের মুদ্রায় বিভিন্ন পশু-পাখির অভিব্যক্তি ফুটে উঠতে দেখা যায়। মান্দিদের মধ্যে জনপ্রিয় একটা নাচ হলো চাম্বল মিসাআ। এই নাচে চাম্বল গাছের (Artocarpus chaplasha Roxb.) ফল একটুকরা কাপড়ের একপ্রাণেÍ বেধে অপর প্রান্ত একজন যুবকের কোমড়ে পেঁচিয়ে বানরের লেজ সদৃশ বানানো হয়। নাচের তালে তালে চাম্বল ফল বাধা কাপড়ের তৈরি লেজ যুবকের পশ্চাৎদেশে ঘুরতে থাকে, আর যুবকটি হাত মুখের অভিব্যক্তি দিয়ে বানরের দুষ্টুমি করার দৃশ্য ফুঁটিয়ে তোলে। এছাড়া দখ্রæসুআ নাচে দুখ্রæ বা ঘুঘু (Streptopelia chinensis) পাখির ধান খাওয়ার, দমি গংআ নাচে মোরগের (Gallus domesticus) লেজ নোয়ানো, মাকবিল রুআ নাচে মাকবিল বা ভল্লুকের (Selenarctos thibetanus), আমবেøথং খল্লা নাচে আমড়া (Spondias pinnaata Kurz.) কুড়ানো, দোসিক মিগারু চাআ নাচে টিয়া পাখির (Psittacula krameri) কাউন(Setaria italica) খাওয়ার, হামাক মিখপ চাআ নাচে বানরের(Setaria italica) ভুট্টা(Zea mays) খাওয়া, খিল অক্কা নাচে জুম থেকে তুলা (Gossypium sp.) সংগ্রহের অঙ্গভঙ্গিমা ফুটিয়ে তোলা হয়।


সাংসারেক ধর্ম কোন পুঁথিভিত্তিক ধর্ম নয়। সাংসারেক ধর্মের সমস্ত কিছুই মুখে মুখে বাহিত হচ্ছে-চর্চিত হচ্ছে পরম্পরাগত ভাবে। চালের গুড়োর সাথে পানি দিয়ে ক্বাথ তৈরি করে ওয়ান্নাতে আগত সকল অতিথিদের কপালে পাখির পায়ের যে চিহ্ন এঁেক দেওয়ার রীতি রয়েছে একে ওয়ানচিথক্কা বলে। মান্দি সৃষ্টিতত্ত¡ অনুসারে, পৃথিবী সৃষ্টির বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে যখন বিশাল জলরাশির বুক ভূভাগের সৃষ্টি হয়েছিল সেটা ছিল পুরোটাই কর্দমাক্ত। সেই কর্দমাক্ত ভ‚ভাগে প্রথম যে প্রাণীর পায়ের ছাপ পড়ে ছিল সেটা হলো দোগুগুর। সৃষ্টিতত্তে¡র সেই ঘটনাকে স্মরণ করেই যুগ যুগ ধরে মান্দিরা ওয়ান্নাতে দোগুগু(Columba livia domestica )র পায়ের ছাপের আদলে আগত অতিথিদের কপালে প্রতীক চিহ্ন এঁকে দিয়ে আসছেন।


সাংসারেক বিভিন্ন আমুয়া এবং ওয়ান্নাতে রাক্কাশি আমুয়া. রুগালা, জলআন্না বা বিশিরি পর্বে দেবতাদের তুষ্ট করার কাজে ধূপ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই ধূপকে মান্দি ভাষায় বলে সাসাৎ। সাসাৎ সাধারণত বলশাল ফাং (ঝযড়ৎবধ ৎড়নঁংঃধ) এর সেক্কি (কষ) থেকে তৈরি করা হয়ে থাকে। সাসাৎ সংগ্রহের জন্য মান্দিরা ১০-১৫ বছর বয়সী শালগাছের গোড়ায় ২-৩ ইঞ্চি কাÐের চামড়া ভেদ করে কেটে রাখেন। কাটার ১৫ দিন পর কষ বের হয়ে গাছের গোড়ায় জমা হয়। এই সেক্কি বা কষ শুকিয়েই সাসাৎ বানানো হয়। 


শিকারের প্রচলন থাকলেও সেটা অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিকতা বজায় রেখে করার রীতি। প্রকৃতির নিরঙ্কুশ বিনাশ কোনভাবেই কাম্য নয় সাংসারেক বিশ্বাসীদের নিকট। বাস্তুতন্ত্রের অন্তর্গত বিভিন্ন খাদ্যশৃঙ্খলকে সজীব রাখার ভাবনা সাংসারেক ধর্ম বিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ এক দিক। সাংসারেকদের বিভিন্ন আমুয়া বা আচারের খ্রি.তায় প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ কেন্দ্রিক আপন দর্শনের পরিচয় মেলে। ওয়ান্নার সর্বশেষ কৃত্যটির নাম কাত্তিগালা। কাত্তিগালায় ওয়ান্নাতে দামা,খ্রাম,নাথোক,রাং প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র বাজানোর জন্য যে বাঁশের কাঠি ব্যবহার করা হয় সেগুলো একসাথে কলাপাতায় জড়ো করে খামাল মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে বিসর্জন দেন। কাত্তিগালার খ্রি.তায় একজায়গায় আমরা দেখতে পাই খামাল উচ্চারণ করেন - 

বিলসি না রাঙ্গলখুদে মাংসা সাংচিকি চাব

মাচ্ছাবা আবাখুদে বিলসি না জানা মাংসা মাংচিকি চাব। 


ভাবানুবাদ ঃ বাঘ জুম ক্ষেতেও আসে, অভ‚ক্ততা হেতু যাতে মানুষের কোন ক্ষতি না করে। বাঘও যাতে প্রতিবছর অন্তুত একটি বানর কামড়ে খেতে পারে।


অর্থ্যাৎ এখানে সাংসারেক খ্রি.তার মাধ্যমে খাদ্যশৃঙ্খলের সজীবতার বজায় রাখার আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। আবার সাংসারেক চর্চা মতে, ফাল্গুন চৈত্র মাসে যখন সামাখ্যি ফুল (Clerodendrum viscosum) ফোটার সময় হয় তখন মিদ্দি মিসি-সালজং আসেন সকল প্রাণের জন্য পরবর্তী একবছরের খাদ্য বিলিবন্টনের ব্যবস্থা করতে। গালমাকদু.আতে দেবতারা মান্দিদের কার ঘরে কিরকম ফলসাদি উঠবে সেই বিলিবন্টন করে যান। এখানে শুধু মানুষেরই নয় প্রাকৃতিক পরিবেশের সকল প্রাণের নাকি খাবারের বিলিবন্টন ব্যবস্থা হয়ে থাকে। অর্থ্যাৎ বাস্তুসংস্থানের সকল খাদ্যশৃঙ্খলের বহমানতার ব্যাপারটি বেশ স্পষ্ট সাংসারেক জীবনাচারে।


৪.

I was born a Lakota and I shall die a Lakota. Before the white man came to our country the Lakota were a free people. They made their own laws and governed themselves as it seemed good to them. The priests and Ministers tell us that we lived wickedly when we lived before the white man came among us. Whose fault was this? We lived right as we were tought it was right. Shall we be punished for this? I am not sure that what these people tell me is true.- Red Cloud [Farewell Speech of Red Indian Leader to Lakota people, July 4, 1903]

চুনিয়া নৈরাশ্যবাদী নয়, চুনিয়াতো মনে প্রাণে 

নিশিদিন আশার পিদ্দিম জে¦লে রাখে।

চুনিয়া বিশ্বাস করে;

শেষাবধি মানুষেরা হিংসা-দ্বেষ ভুলে

পরস্পর সৎপ্রতিবেশী হবে।


[ কবি রফিক আজাদের চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া কবিতার অংশবিশেষ]


স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ও প্রাণবৈচিত্র্যের সাথে মান্দি জীবন-সংস্কৃতির নাড়ীর সম্পর্ক। উৎপাদন ব্যবস্থা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিবর্তনসহ আরো নানাবিধ কারণে সাংসারেক ধর্ম ও ধর্মাশ্রিত সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল অনেকটাই বদলে গেছে মান্দি সমাজে, যেমনটা বদলে গেছে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের। প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে রাষ্ট্রের একের পর এক আত্মঘাতি প্রকল্প বদলে দিয়েছে শালবনের বাস্তুতন্ত্রের ধরণকে- বলা চলে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে প্রাণবৈচিত্র্যকে, হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে শালবনকেন্দ্রিক মান্দিদের জীবন ও জীবনাচারকে। বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতেও প্রাণবৈচিত্র্য কেন্দ্রিক মান্দিদের আপন জ্ঞানের, আপন সংস্কৃতির পূর্ণ বিলুপ্তি হয়নি এখনো। এখনো মান্দিরা তাদের জীবনাচারের প্রাকৃতিক পরিবেশের রক্ষণাবেক্ষনের চর্চা অব্যহত রেখে চলেছেন। মান্দিদের জীবন-সংস্কৃতিতে প্রাণবৈচিত্র্য ও সংরক্ষণ ভাবনা বেশ বড় একটা পরিসর। এখানে শুধুমাত্র সাংসারেক ওয়ান্না পাঠপূর্বক প্রাণবৈচিত্র্য ও সংরক্ষণ কেন্দ্রিক মান্দিদের বিশ্বাস ও জ্ঞানের কিঞ্চিত আলাপ জমানোর মাধ্যমে কিছু নমুনা হাজির করার প্রয়াস চালানো হয়েছে। কোন এলাকার বাস্তুতন্ত্র ও প্রাণবৈচিত্র্যকে বুঝতে হলে, ঐ নির্দিষ্ট এলাকার জাতিগোষ্ঠী সমুহের লোকায়ত জ্ঞান ও সংস্কৃিত পাঠ অত্যন্ত জরুরি একটা বিষয়। স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ও প্রাণবৈচিত্র্যের সজীবতা টিকিয়ে রাখতে জাতিগোষ্ঠী সমূহের আপন আপন জ্ঞান ও তার চর্চাকে সর্বাগ্রে আমলে নিতে হবে। সাংসারেক বিশ্বাস মতে, বাস্তুতন্ত্রের প্রাণবৈচিত্র্যের কোন মালিকানা থাকে না, থাকে টিকে থাকার জন্য পারস্পরিক যুথবদ্ধতা।




একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

চুনিয়ার সাংসারেক ওয়ান্না পাঠ ঃ প্রাণবৈচিত্র্য ও সংরক্ষণ কেন্দ্রিক মান্দিদের আপন বিশ্বাস ও আপন জ্ঞান কাঠামোর কিছু বিক্ষিপ্ত আলাপ